সাকিব আল মামুন: একটি পরিবারের সব স্বপ্নকে ঘিরে ছিল একমাত্র ছেলে তানভীর হোসেন তুহিনকে। পড়াশোনা শেষ করে পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ১৯ বছর বয়সী এই তরুণ। কিন্তু একটি জুতাকে কেন্দ্র করে সহপাঠীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে সেই স্বপ্নের অকাল সমাপ্তি ঘটে। ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে হত্যাকান্ডে প্রাণ হারান তুহিন।
এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সাত বছর। কিন্তু আজও বিচার পায়নি তার পরিবার। একমাত্র ছেলেকে হারানোর শোকে কিছুদিন পর স্ট্রোক করে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন বাবা মানিক মিয়া। আর মা ও বোনের কণ্ঠে আজও একটাই দাবি—তুহিন হত্যায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
তানভীর হোসেন তুহিন গোলাপগঞ্জ উপজেলার হেতিমগঞ্জের কোনাচর দক্ষিণভাগ পলিতাফর গ্রামের প্রবাসী মানিক মিয়ার ছেলে। এক মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ছিল মানিক মিয়া ও রিনা বেগমের সংসার। ছেলে ও মেয়েকে ঘিরে ছিল পরিবারের নানা স্বপ্ন। তবে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।
২০১৯ সালের ২৪ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ঘটে যায় নির্মম ওই হত্যাকাণ্ড।
জানা যায়, তুহিন সিলেট এমসি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শির্ক্ষাথী ছিল। সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ছয় মাস মেয়াদী বেসিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কোর্সে ২৮তম ব্যাচে ভর্তি হয় সে। ঘটনার দিন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রবেশের সময় নির্ধারিত স্থানে জুতা রেখে কম্পিউটার ল্যাবে প্রবেশ করেন তুহিন। ল্যাব থেকে বের হয়ে নির্ধারিত স্থানে জুতা না পেয়ে খোঁজ করতে থাকেন। একপর্যায়ে রাহাত সাদী কামরান নামে অন্য এক প্রশিক্ষণার্থীর পায়ে দেখতে নিজের দাবি করেন। প্রশিক্ষকের মধ্যস্থতায় জুতা ফেরত প্রদান করা হয়। এ ঘটনার রেশ ধরেই পরিকল্পিতভাবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভেতরে কেন্টিনের সামনে পিঠিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। তাৎক্ষনিক সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে গুরুতর আহত অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়ার সময় ভৈরব এলাকায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
এ ঘটনায় তুহিনের চাচা নাজিম উদ্দিন বাদী হয়ে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২-৩ জনকে আসামি করে মোগলাবাজার থানায় মামলা (নং-৮ তারিখ-২৪/০৭/২০১৯) করেন।
আসামীরা হলেন, দক্ষিণ সুরমার আলমপুর গ্রামের মজিবুর রহমানের ছেলে এমদাদুর রহমান, গোলাপগঞ্জের হাজীপুর এওলাটিকর গ্রামের সেলিম উদ্দিনের ছেলে রাহাত সাদী কামরান, দক্ষিণ সুরমার কদমতলী গ্রামের আব্দুল হালিমের ছেলে আবু কুদরত তায়েফ, আলমপুর গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে কামরুল ইসলাম, একই গ্রামের সজ্জাদ আলীর ছেলে আজাদ আল রাহি, ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার বারাকান্দি গ্রামের হারুনুর রশীদের ছেলে ফারুক আহমদ, গোয়াইনঘাট উপজেলার রাজনগর গ্রামের সাহাব উদ্দিনের ছেলে ফেরদৌস মাহমুদ, দক্ষিণ সুরমার মির্জানগর গ্রামের দুলু মিয়ার ছেলে সায়েম আহমদ, জকিগঞ্জ উপজেলার বলরামেরচক গ্রামের দেলু নাথের ছেলে বাবুল নাথ এবং পালপুর গ্রামের আলমাছ হোসেনের ছেলে শিহাব হোসেন।
মামলার ৪ আসামিকে গ্রেফতার করা হলেও রহস্যজনক কারনে অধিকাংশকেই গ্রেফতার করা হয়নি। গ্রেফতারকৃত ৪ আসামীই বর্তমানে জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে রয়েছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে জারি হয়েছে গ্রেফতারী পরোয়ানা। কেউ হাজিরা দিচ্ছেন শুনানির দিনে। ঘটনার ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে ৭বছর। এখনো বিচার পায়নি নিহত তুহিনের পরিবার। অধরা রয়ে গেছেন আসামীরা। ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার।
এদিকে নিহত তুহিনের পিতা মানিক মিয়া দীর্ঘ ৭ বছর থেকে ছেলে হারাবার শোকে স্ট্রোক করে শয্যাশয়ী রয়েছেন। ঘটনার সময় তিনি সৌদি আরবে ছিলেন। প্রায় সপ্তাহ খানেক পরে দেশে ফিরে আসেন তিনি। একমাত্র ছেলে কে হারিয়ে নিস্তব্দ হয়ে পড়েন। কিছুদিন পর স্ট্রোক করেন। বর্তমানে শয্যাশয়ী অবস্থায় রয়েছেন। তুহিন হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে ফাঁসির দাবি করেন তিনি।
মা রিনা বেগম দ্রুত হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবি জানান তিনি।
নিহত তুহিনের বোন ও কাওছারাবাদ কলেজের শিক্ষিকা সাবেরা খানম উর্মী জানান, ‘৭বছর পার হয়ে গেল, একমাত্র ভাই হত্যার বিচার আজও পেলাম না। বোন হিসেবে আমার একটাই চাওয়া আসামিদের দ্রত গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনা হোক।’
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইয়ামিন চৌধুরী বলেন, ‘মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার বিচারিক কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি। আমরা আশা করছি, সাক্ষ্যগ্রহণসহ মামলার অন্যান্য কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।’
Tags
গোলাপগঞ্জ